Bexit: Who Losses Who Winsব্রেক্সিট : কার হার কার জিত রিনভী তুষার

 ব্রেক্সিট : কার হার কার জিত

রিনভী তুষার

একটা চুক্তি দরকার ছিল। চল্লিশ বছরের বেশি সময়ের সংসার। কিন্তু কোনো পক্ষই চুক্তির বিষয়ে একমত হতে পারছিল না। এমনকি বরিস জনসন তো বলেই বসেছিলেন ‘কোনো চুক্তি ছাড়াই বিচ্ছেদের পথে হাঁটবে তার দেশ’। এই ব্যবস্থাকে বলা হচ্ছিল ‘নো ডিল’। কিন্তু নাটকীয়ভাবে ক্রিসমাসের সন্ধ্যায় দুই পক্ষই একমত হয় চুক্তির বিষয়ে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম তাই এই ক্রিসমাসকে নাম দিয়েছে ‘ব্রিক্সমাস’।  হাঁফ ছেড়েছেন অনেকেই। যারা ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন তারা স্বভাবতই খুশি। যারা বিপক্ষে ছিলেন তাদের জন্য এই চুক্তি তিক্ত-মধুর।  অনেকটা নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। ব্রেক্সিটের এই চুক্তিতে কার লাভ হলো আর কার ক্ষতি? একটা চুক্তির ওপর নির্ভর করে সহজে এর উত্তর দেওয়াটা অসম্ভব। কিন্তু চুক্তির কিছু মূল বিষয় নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে। পাশাপাশি চুক্তির কারণে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কোন দিকে যেতে পারে তাও অনুমান করা যেতে পারে। এই চুক্তির বিষয়ে একটা কথা বলে রাখা ভালো। এই চুক্তিকে যুক্তরাজ্যের সরকার তার দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরছে ‘আমরা কি পেলাম’ বা সহজ ভাষায় ‘সাফল্যের স্মারক’ হিসেবে। কিন্তু ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তুলে ধরছে যুক্তরাজ্য কী হারাল তার খতিয়ান হিসেবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এই আচরণের পেছনের কারণ অনুমান করা খুব একটা কঠিনও নয়। তারা চায় না আর কোনো সদস্য রাষ্ট্র যুক্তরাজ্যের মতো বেরিয়ে যাক।


ক্যারিবিয়ান  দ্বীপ অ্যাংগোয়েলা ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড নর্দান আয়ারল্যান্ড-এর অংশ। যদিও তাদের নিজস্ব সরকার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তারা ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরির অংশ। ভিন্ন সরকার ব্যবস্থার কারণে ব্রেক্সিট বিষয়ে তারা কোনো ভোট দিতে পারেনি। এই দ্বীপ লন্ডন থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। কিন্তু তাদের জন্য ব্রেক্সিটের তিক্ত বাস্তবতা আর দশটা সাধারণ যুক্তরাজ্যের নাগরিকের চেয়ে আলাদা তো নয়ই, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি। ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী এই দ্বীপের ১৫ হাজারেরও বেশি বাসিন্দা ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্ভর করে প্রতিবেশী দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের ওপর। সেন্ট মার্টিন আবার ফ্রান্সের অংশ। ২০১৭ সালে এই দ্বীপে আঘাত হেনেছিল ভয়ংকর হ্যারিকেন ‘ইরমা’। গোটা দ্বীপ তছনছ করা সেই হ্যারিকেনের ক্ষতের দগদগে প্রলেপ এখনো রয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সেই সময় এই দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বরাদ্দ দিয়েছিল মোটা অংকের অর্থ। এমনকি দ্বীপের বাজেট ঘাটতির একটা বড় অংশের জোগানদাতাও ছিল ইইউ। কিন্তু ব্রেক্সিটের ফলে এই দ্বীপের মানুষরা এরকম কোনো অর্থ সাহায্য আর পাবে না।  তার মানে ব্রেক্সিট অ্যাংগোয়েলান দ্বীপের মানুষের জন্য মোটেও সুখের কিছু নয়।  তাই দ্বীপের বেশিরভাগ মানুষ চাইছে যুক্তরাজ্যের ছায়া থেকে বের হয়ে যেতে।


এতো গেল ছোট দ্বীপ ছোট সমস্যা। এই সমস্যার আছে বিকট চেহারাও। ব্রেক্সিট ভোট মূলত গোটা যুক্তরাজ্যকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলেছে সেই ২০১৬ সালেই।  ৬২ ভাগ স্কটিশ এবং ৫৫.৮ ভাগ আইরিশ ভোট দিয়েছিল ‘রিমেইন’-এর পক্ষে।  বিবিসি সেই সময় শিরোনাম করেছিল ‘স্কটল্যান্ড ইইউতে থাকতে চাইছে যেখানে যুক্তরাজ্য চাচ্ছে বেরিয়ে যেতে’। গণমাধ্যমের এই রকম কড়কড়ে শিরোনাম থেকেই বোঝা যায় জাতিগত দ্বন্দ্বের গভীরতা কত ব্যাপক ইংলিশ আর স্কটিশদের মধ্যে। ব্রেক্সিটের পক্ষে ছিল ওয়েলস আর ইংল্যান্ড। বিপক্ষে ছিল স্কটল্যান্ড আর নর্দান আয়ারল্যান্ড। ধারণা করা হয় নর্দান আয়ারল্যান্ডের যে বা যারা ‘রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ড’-এর অংশ হতে চান না তারাই শুধু ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। প্রথমেই বলতে হয় স্কটিশদের কথা। ব্রেক্সিট বিষয়ে তাদের ৬২ শতাংশ মানুষের কথা কেউ কানেই তোলেনি। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই স্কটল্যান্ডকে ইইউর বাইরে বেরিয়ে যেতে হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশটির স্বাধীনতার প্রশ্নে। ইউগঋ নামে একটি ওয়েবসাইটের জরিপ যুক্তরাজ্যে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য মতে অন্য যে কোনো সময়ের  চেয়ে সবচেয়ে বেশি স্কটিশ চাইছে তাদের আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হোক।  স্কটিশ স্বাধীনতার পালে জোর হাওয়া দিচ্ছে নতুন হওয়া ‘ব্রেক্সিট চুক্তি’।


স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা এসএনপি এক এক করে চুক্তির ক্ষতিকারক দিকগুলো স্কটল্যান্ডের মানুষের সামনে তুলে ধরছে। ক্ষতির প্রথম সারির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে আলুকে। যুক্তরাজ্য ইইউর সঙ্গে যেই চুক্তি করেছে তাতে ব্রেক্সিটের পরে স্কটিশ আলুচাষিরা তাদের ১১২ মিলিয়ন পাউন্ডের বাজার হারাবে।  শুধু তাই নয় গোটা যুক্তরাজ্যেই কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ কমে আসবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষকরা। লাভ-ক্ষতি যাই হোক, মোদ্দা কথা হলো ৬২ শতাংশ স্কটিশ চেয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতে। এখন এই হেরে যাওয়াই তাদের উৎসাহিত করছে ইউকে নামের আরেক ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যেতে। ২০২১ সালের মে মাসে স্কটিশ পার্লামেন্টের নির্বাচন হবে। ক্ষমতায় থাকা স্কটিশ জাতীয়তাবাদী দল গেল মাসের বার্ষিক সভায় ঘোষণা দিয়েছে সেকেন্ড রেফারেন্ডাম আয়োজনের। স্কটিশ স্বাধীনতা প্রশ্নে এই রেফারেন্ডাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই যদি স্কটিশরা এসএনপির এই ম্যানিফেস্টোর ওপর ভর করে এই দলটিকে আবার ক্ষমতায় আনে তবে সেকেন্ড রেফারেন্ডামের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ওয়েস্টমিনস্টারের ওপর চাপ বাড়বে। যদিও বরিস জনসন সেকেন্ড রেফারেন্ডামের বিষয়ে সোজাসুজি ‘না’ বলে দিয়েছেন। তার কথা হলো, সেদিনই না একটা রেফারেন্ডাম হলো! বারবার হবে নাকি! এরকম রেফারেন্ডাম এক প্রজন্মে একটাই হতে পারে। কিন্তু এসএনপি যদি নির্বাচনে জিতে যায় আর যদি কনজারভেটিভ ব্রিটিশ সরকার স্কটিশ স্বাধীনতার প্রশ্নে সেকেন্ড রেফারেন্ডাম না দেয় তবে দিন যত গড়াবে স্বাধীন স্কটল্যান্ডের ধারণা ততই জনপ্রিয়তা পাবে।  লেবার পার্টি যদিও ব্রেক্সিট চুক্তিতে বরিস জনসনকে সমর্থন করেছে কিন্তু স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে বরিস জনসনকে সমর্থন না করা কিংবা নীরব থাকাতে তাদেরই লাভ। কারণ যদি স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যায় তবে কনজারভেটিভ পার্টির আগামী নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনাও কমে আসবে। আর এই সুযোগ লেবার হাতছাড়া করতে চাইবে বলে মনে হয় না।


এতো গেল স্কটিশ কাহন। এবার বলা যাক রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ড এবং নর্দান আয়ারল্যান্ড বিষয়ে। রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ড স্বাধীন রাষ্ট্র আর নর্দান আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ। কিন্তু এই দুদেশের মধ্যে আক্ষরিক অর্থেই কোনো আনুষ্ঠানিক সীমানা নির্ধারণ করা নেই। যদিও দুই দেশকে এক করে অভিন্ন আয়ারল্যান্ড করার বিষয়ে এখনো অনেকে যেমন তৎপর, তেমনি একদল তৎপর দুই দেশকে আলাদা রাখার বিষয়ে। গোটা ‘ব্রেক্সিট’ চুক্তিতেই এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ড আর নর্দান আয়ারল্যান্ড দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের লাশের ওপর। বেলফাস্টে যাওয়া গেলে তাই এখনো চোখে পড়বে ‘শান্তির দেয়াল’। যা সাক্ষী দিচ্ছে কয়েক প্রজন্মের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের। কিন্তু ‘ব্রেক্সিট’ চুক্তি দুই আয়ারল্যান্ডের ভেতরকার আনুষ্ঠানিক সীমানার ধারণাকে আবার ফিরিয়ে আনছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ স্থানীয় আইরিশ ব্যবসায়ীরা। তবে অনেক নর্দান আইরিশ ব্রেক্সিটকে দেখছেন যুক্তরাজ্যের ছায়া থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে। স্টিভেন ডি লেভিট এবং স্টিফেন জে ডুবনার তাদের ‘থিংক লাইক আ ফ্রিক’ বইয়ে বলেছেন-রাজনীতিকরা যখনই কোনো সঠিক এবং ভুলের মানদণ্ড বিচার করে কোনো সিদ্ধান্ত নেন তখন প্রথমেই যাকে হত্যা করা হয়, তার নাম সত্য।


ব্রেক্সিট চুক্তিতেও তাই হয়েছে। কথা নেই বার্তা নেই ব্রিটিশ রাজনীতিবিদরা হঠাৎ করেই তাদের সামুদ্রিক সীমার সার্বভৌমত্বের বিষয়ে আপসহীন আচরণ করা শুরু করল। মনে হলো যেন ইইউভুক্ত দেশের জেলেরা যুক্তরাজ্যের সব মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশ নেভি তো বলেই বসল তারা পহেলা জানুয়ারি থেকে সমুদ্রসীমা পাহারা দেবে। কিন্তু এখানে সত্য যতটা সত্য তার চেয়ে বেশি হাস্যরসাত্মক বিষয় রয়েছে। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে মাছের অবদান শূন্য দশমিক এক শতাংশেরও কম। তার ওপর যুক্তরাজ্যের জলসীমায় পাওয়া যাওয়া মাছের ৭০ শতাংশের ক্রেতা ইইউ; বিশেষভাবে ফ্রান্স এবং ইতালি। তারও ওপর বড় সত্য হলো যুক্তরাজ্যের জলসীমায় যে মাছ পাওয়া যায় তা খোদ ব্রিটেনবাসীরাই পছন্দ করে না। কারণ তাদের পছন্দের ‘ফিশ অ্যান্ড চিপস’-এর জন্য দরকার কড মাছের।  আর সেই কড আসে ইইউ থেকে।


এতো গেল ফ্যাক্ট বা সত্য হত্যার একটা উদাহরণ, এরকম আরও অনেক উদাহরণ একটু ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে। তবে তবুও ভালো যে একটা চুক্তি হয়েছে। কোনো চুক্তি না হলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ছয় শতাংশ কমে যেত। চুক্তি হওয়াতেও কমবে, কিন্তু তা কমবে চার শতাংশ। কিন্তু এত বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্তের পরও আপনি হয়তো গোঁ ধরে বসে আছেন শুরুর প্রশ্নে, নিশ্চয়ই সোজাসুজি জানতে চাইছেন ‘তো কে জিতল কে হারল?’ আপনার প্রশ্নের জবাবে ব্রেক্সিট বিষয়ে ইইউর প্রধান নেগোশিয়েটর মিশায়েল বার্নিয়ার বলেছেন, ‘লুজ লুজ সিচুয়েশন’।  তবে হারজিতের বাইরেও আপনার জন্য আমার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। ধরেন যদি স্কটল্যান্ড ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড নর্দান আয়ারল্যান্ড থেকে বের হয়ে যায় তবে যুক্তরাজ্যের নাম বদলে কী রাখা হবে? কিংবা কী হবে তাদের ইউনিয়ন জ্যাক পতাকার ভবিষ্যৎ? কেমন হবে তাদের পরবর্তী পতাকার নকশা?


লেখক রাজনীতি গবেষক এবং অভিবাসন উন্নয়নকর্মী

No comments:

Post a Comment